ফলোআপঃ
থানা হাজতে দূর্জয়ের আত্মহত্যা, পরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ পরিবারেরঃ চকরিয়া থানার ওসি প্রত্যাহার
ফলোআপঃ
# দূর্জয়ের মায়ের আহাজারি প্রতিবেশীরা শান্তনা দিয়ে কুলিয়ে ওঠে পারছেনা
# ওসি শফিকুল ইসলাম প্রত্যাহার
# নতুন ওসি তৌহিদুল আনোয়ার
এম জিয়াবুল হক.চকরিয়া
কক্সবাজারের চকরিয়া থানা হাজতে গলায় ফাঁস লাগিয়ে যুবক দুর্জয় চৌধুরীর মৃত্যুর ঘটনাটি পরিকল্পিত হত্যা বলে অভিযোগ করেছেন তাঁর বাবা কমল চৌধুরী। গতকাল শনিবার কক্সবাজার শহর আয়োজিত মানববন্ধনে তিনি এ অভিযোগ করেন।
মানববন্ধনে কমল চৌধুরী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমার ছেলে দূর্জয় চৌধুরীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমার ছেলে আত্মহত্যা করেনি। আমাকে যদি দা-ছুরি দিয়ে কেটেও ফেলে তারপরও আমি বিশ্বাস করি না আমার ছেলে আত্মহত্যা করেছে। এই ঘটনায় পুলিশের গাফিলতি আছে।
গাফিলতি আছে বিধায় তারা আমদেরকে আইওয়াশ করানোর জন্য তিনজন পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। যদি এরকম না হতো তাহলে পুলিশ প্রত্যাহার করলো কেন ? থানার সিসি ফুটেজে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১টা ২২ মিনিট পর্যন্ত তাকে চলাফেরা করতে দেখা গেছে। এরপরে আর কোন ভিডিও নাই কেন?
তিনি বলেন, থানায় ফাঁসিতে ঝুলানোর যে ছবি দেখতে পেয়েছি, দুই ইঞ্চি ফাঁক অবস্থায় লোহার গ্রীলে হাত ধরে কীভাবে আত্মহত্যা করা সম্ভব? তাছাড়াও আমার ছেলের ল্যাপটপ ও ব্যাক্তিগত ব্যাগটাও পাচ্ছি না। গত বৃহস্পতিবার আমার ছেলে সকার সাড়ে ৯টায় অফিসে চলে যান। পরে ওইদিন চকরিয়া সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা রাবেয়া খানম আমাকে সকাল ১১টার দিকে কল করে স্কুলে যেতে বলেন। আমি ১০ মিনিটের মধ্যে স্কুলে যায়। ওখানে গিয়ে দেখি শিক্ষকরা সবাই বসে আছে। সেখানে আমার ছেলে দূর্জয়ও ছিলো।
ছেলের মৃত্যু শোকে কাতর হয়ে পড়েছেন বাবা কমল চৌধুরী। অন্যদিকে ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় শুক্রবার সকাল থেকে বাড়িতে কাঁদতে কাঁদতে গড়াগড়ি খাচ্ছেন তাঁর মা বেবী চৌধুরী। তাকে শান্তনা দিতে এগিয়ে যাচ্ছেন প্রতিবেশিরা। কিন্তু কোন শান্তনাই তাকে ধমিয়ে রাখতে পারছেনা। প্রশাসনের কাছে ছেলে হত্যার বিচার চেয়েছেন তিনি।
দুর্জয়ের বাবা কমল চৌধুরী বলেন, স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা রাবেয়া খানম আমাকে বলে আপনার ছেলে টাকা আত্মসাত করেছে। তখন আমি সকল শিক্ষকের সামনে বলি আমার ছেলে যদি টাকা আত্মসাত করে, আমি সব টাকা পরিশোধ করবো, মুচলেখাও দিবো। প্রয়োজনে ওর চাকরি চলে যাক কিন্তু আপনারা অন্যায়ভাবে কিছু করবেন না। তারপরও কেন ওরা সবাই মিলে আমার ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করলো ? তার বিচার আমি চাই।
তিনি আরও বলেন, ওই স্কুলের সাবেক প্রধান শিক্ষক ও বর্তমান প্রধান শিক্ষিকা রাবেয়া খানমের দূর্ণীতির সমস্ত ডকুমেন্ট আমার ছেলের ল্যাপটপে আছে। আমার ছেলে উপজেলার মধ্যে সেরা কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে সেরা সনদ পেয়েছে। আমার ছেলের ল্যাপটপে এমন কিছু তথ্য ছিলো, যা ফাঁস করে দেবে ভেবে দূর্জয়কে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করানো হয়েছে।
তিনি শীঘ্রই ছেলে হত্যাকান্ডের ঘটনায় যারা যারা জড়িত সবাইকে আসামী করে আদালতে মামলা করবেন বলেও মানববন্ধনে জানিয়েছেন।
এদিকে চকরিয়া থানা হাজতে যুবক দুর্জয় চৌধুরীর মৃত্যুর ঘটনায় চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ শফিকুল ইসলামকে বদলি করা হয়েছে।
কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সাঈফউদ্দীন শাহীন স্বাক্ষরিত পরিপত্রে শনিবার (২৩ আগস্ট) বিকেলে এ বদলির আদেশ দেওয়া হয়েছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জসিম উদ্দিন চৌধুরী।
তিনি বলেন, থানা হাজতে যুবকের আত্মহত্যার ঘটনায় চকরিয়া থানার ওসি মোঃ শফিকুল ইসলামক কক্সবাজার পুলিশ কন্ট্রোল রুমের ইনচার্জ পদে
বদলি করা হয়েছে। থানার নতুন ওসি হিসেবে পুলিশ পরিদর্শক তৌহিদুল আনোয়ার সংযুক্ত করা হয়েছে। এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
অপরদিকে শুক্রবার (২২আগষ্ট) সকালে নিহত দূর্জয় চৌধুরীর মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়া হলেও এদিন মেডিকেল বোর্ড না থাকায় তার ময়নাতদন্ত হয়নি। পরে শনিবার (২৩ আগষ্ট) ময়নাতদন্ত শেষে বেলা ৩টার দিকে তার লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এদিন বেলা ৪টার দিকে তার লাশ চকরিয়া পৌরসভার ভরামুহুরী হিন্দুপাড়া এলাকার সামাজিক শ্মশানে দাফন (শ্মশানস্ত) করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার ২১ আগস্ট সন্ধ্যার আগে চকরিয়া সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রাবেয়া খানম ওই স্কুলের অফিস সহকারি দুর্জয় চৌধুরী চেক জালিয়াতি করে ও নগদে প্রতিষ্ঠানের ২ লাখ ৮৩ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছেন মর্মে চকরিয়া থানায় একটি অভিযোগ করেন। এরপর পুলিশ ওই অভিযোগের ভিত্তিতে দূর্জয় চৌধুরীকে হাজতে আটকে রাখেন। পরবর্তীতে শনিবার ভোর ৪টার দিকে হাজতে গলায় ফাঁস লাগানো ( ঝুলানো) অবস্থায় তার মৃতদেহ উদ্ধার করেন চকরিয়া উপজেলার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারি কমিশনার (ভুমি) রুপায়ন দেব। এসময় তিনি নিহত দূর্জয় চৌধুরীর প্রাখমিক সুরতহাল রিপোর্ট তৈরী করেন।
কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুত্রে জানা যায়, চকরিয়া থানা হাজতে স্কুলের অফিস সহকারী দূর্জয় চৌধুরীর আত্মহত্যার ঘটনায় শুক্রবার (২২ আগস্ট) চকরিয়া থানার এএসআই হানিফ মিয়া ও দুই কনস্টেবলকে প্রত্যাহার করে জেলা পুলিশ লাইনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও জেলা পুলিশের মুখপাত্র জসিম উদ্দিন চৌধুরীকে প্রধান করে ঘটন করা হয়েছে তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি। এতে অন্য দুই সদস্য হলেন চকরিয়া সার্কেলের সহকারি পুলিশ সুপার ও চকরিয়া কোর্ট পুলিশের পরিদর্শক মোঃ আনোয়ার উল ইসলাম।
চকরিয়া সার্কেলের সহকারি পুলিশ সুপার (এএসপি) অভিজিৎ দাশ বলেন, দুর্জয় চৌধুরীর মৃত্যুর ঘটনায় জেলা পুলিশ সুপারের নির্দেশে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জসিম উদ্দিন চৌধুরীকে প্রধান করে তিন সদস্যের গঠিত তদন্ত কমিটি ইতোমধ্যে তদন্ত কাজ শুরু করেছে। আশাকরি খুব দ্রুত সময়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া সম্ভব হবে।















