জনবল সংকটে চিকিৎসা সেবা ব্যাহত: ৫০শয্যায় উন্নীত করণ সময়ের দাবী
* মাসে চিকিৎসা নিয়েছেন ৩০ হাজার রোগী!
* ৩১ শয্যা হলেও চিকিৎসা দেয়া হয় ৩ গুণ বেশী রোগীকে
* ৩ শিফটে ২৪ ঘন্টা হাসপাতাল চালু থাকলেও লোকবল ১ শিফটেরও নেই।
* হাসপাতালের ৭ টি ওয়ার্ড, ৫০ টি টয়লেট পরিস্কারের জন্য মাত্র ২ জন ক্লিনার!
পেকুয়া উপজেলার ২ লক্ষাধিক মানুষের সরকারি চিকিৎসা সেবার একমাত্র অবলম্বন হচ্ছে পেকুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। সাবেক যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ১৯৯৮ সালে সৌদি সরকারের অর্থায়নে হাসপাতালটি নির্মাণ করেন। পরে এ হাসপাতালটি ২০ শয্যায় উন্নীত করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রতিস্থাপন করেছিলেন। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে আরো ১১ শয্যা বৃদ্ধি করলে হাসপাতালটি ৩১ শয্যায় উন্নীত করা হয়। এলাকায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে কালের পরিক্রমায় এ হাসপাতালে রোগীর সংখ্যাও বাড়তে থাকে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিদিন ১ থেকে দেড় হাজার রোগী এই হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা নিতে আসেন। বহির্বিভাগ ও আবাসিকে চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, অবকাঠামোগত দিক দিয়ে হাসপাতালটি ৫০ শয্যার হলেও জনবল কাঠামোর ক্ষেত্রে ৩১ শয্যার লোকবল দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। আর সেখানেও অর্ধেকের বেশী পদ খালী রয়েছে। তারা জানায়, অফিসিয়ালী ৩১ শয্যার হলেও বাস্তবে তার ৩ গুণ বেশী রোগীকে চিকিৎসা সেবা দেয়া হচ্ছে সীমিত সাধ্যের মধ্যেই। তাছাড়া হাসপাতালে বর্তমানে চিকিৎসা ওয়ার্ড চালু রয়েছে ৬ টি। তৎমধ্যে ১০ শয্যা বিশিষ্ট ওয়ান স্টপ ইমার্জেন্সি সেন্টার, শিশু সাধারণ রোগ ওয়ার্ড, শিশু ডায়েরিয়া, পুরুষ, মহিলা, প্রসূতি ওয়ার্ড ও কেবিন রয়েছে।
তথ্যসূত্র জানায়, স্বাস্থ্য বিভাগের জনবল বিধি অনুযায়ী ৩১ শয্যার এ হাসপাতালে প্রশাসনিক কর্মকর্তা, আবাসিক মেডিকেল অফিসার, উপ-সহকারী মেডিকেল অফিসার সহ চিকিৎসকের মোট পদ রয়েছে ২০ টি। কিন্তু এসব পদে ৪ জন প্রশাসনিক কর্মকর্তা সহ মোট চিকিৎসক রয়েছেন ৯ জন। ৪জন প্রশাসনিক কর্মকর্তা বাদ দিলে চিকিৎসা প্রদান করতে পারেন মাত্র ৫ জন চিকিৎসক। এরমধ্যে ইউনিয়ন সাব-সেন্টারের জন্য ৭ জন চিকিৎসকের পদ থাকলেও তাতে নেই একজন চিকিৎসকও। যার ফলে দিনের পর দিন বন্ধ রয়েছে ইউনিয়ন সাব সেন্টার গুলো। সূত্র জানায়, পেকুয়া উপজেলার ৭ ইউনিয়নের মধ্যে ৬ টি সাব-সেন্টার থাকলে সেগুলো প্রায়সময় বন্ধ থাকে। এছাড়াও হাসপাতালে সেবিকার পদ রয়েছে ২৫ টি। কিন্তু সেবিকা আছেন মাত্র ১৬ জন। ৪ টি ওয়ার্ড বয়ের পদের বিপরীতে আছে মাত্র ১ জন। এই একজন ওয়ার্ড বয় দিয়েই নারী, পুরুষ, শিশু ও লেবার ওয়ার্ড সহ সবগুলো ওয়ার্ড ২৪ ঘন্টা চালু রাখতে হয়। রোগীদের পরীক্ষা নিরীক্ষা করার জন্য মেডিকেল ট্যাকনোলজিষ্ট এর পদ রয়েছে ২ টি। কিন্তু আছেন কেবল ১ জন ট্যাকনোলজিষ্ট। এক্সরে করার জন্য ১জন রেডিওগ্রাফারের পদ থাকলেও সেটি খালী আছে দীর্ঘদিন ধরে। ল্যাব এডেন্ডেন্ট এর পদটিও রয়েছে খালী। মিডওয়াইফের ৪ টি পদের বিপরীতে ৪ জন থাকলেও মাসে গড়ে ১৫০-১৮০ জন ডেলিভারী রোগীকে চিকিৎসাসেবা দেয়া তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি হাসপাতালের সবচেয়ে বেশী যে বিষয়টি সবার দৃষ্টিকটু হয় সেটি হল পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা। অথচ পরিচ্ছন্নতা কর্মীর ৪ টি পদ থাকলেও নিয়োগ পেয়েছেন মাত্র ২ জন। আর এ দুইজনকেই হাসপাতালের অন্তত ৫০ টি টয়লেট, ৩ তলা ও ৪ তলা দুটি ভবনের ৭টি ফ্লুর, ৬টি ওয়াড সহ অফিসগুলো পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব পালন করতে হয়।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, হাসপাতালে ৩টি শিফটে মুটামুটি মানের সরকারি চিকিৎসাসেবা দিতে গেলেও অন্তত ২৫ জন সেবিকা, ১৫ জন ক্লিনার ও ১৫ জন ওয়ার্ড বয় প্রয়োজন। যেহুতু হাসপাতালে প্রসূতী বিভাগে রোগীর সংখ্যা বেশী সেক্ষেত্রে এনএসিইউ ওয়ার্ডটি চালু করা খুবই জরুরী। একজন শিশু বিশেষজ্ঞের অভাবে এই ওয়ার্ডটি চালু করতে না পারায় জন্ম নেয়া অনেক নবজাতকই জরুরী চিকিৎসা সেবা পাচ্ছে না।
২০২৫ সালের জুন মাসের চিকিৎসা সেবা নিতে আসা রোগীর হিসাব বিবরনীতে দেখা গেছে, বহির্বিভাগে ১৮ হাজার ৬৪১ জন নারী, শিশু ও পুরুষ রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। ইনডোরে অর্থাৎ ওয়ার্ডের বেডে চিকিৎসা নিয়েছেন ২ হাজার ৫ শত ৬০ জন রোগী। নরমাল ও সিজারিয়ান মিলে ডেলিভারি হয় ১৩৮ জন। তাছাড়া ১ হাজার ৩ শত ৫০ জন মা গর্ভকালীন সেবা নিয়েছেন। জরুরী বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন ২ হাজার ১ শত ২৪ জন রোগী। তৎমধ্যে এ্যম্বুলেন্স সেবা নিয়েছেন ২৫ জন রোগী। মাত্র ১ হাজার ৬০০ টাকা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে পৌঁছিয়ে দেয়া হয় রোগীকে। ডায়াগনোষ্টিক সেবা নিয়েছেন ২ হাজার ৬ শত ৮৪ জন রোগী। এনসিডি কর্নারে সেবা নিয়েছেন ১ হাজার ৩ শত ৯০ জন রোগী। আই এম সি আই কর্নারে ১৬৩ জন ও রক্ত পরিসঞ্চালন সেবা নিয়েছেন ৬১ জন। তাছাড়াও চোখের চিকিৎসা নিয়েছেন ৪০১ জন রোগী। উক্ত হিসাবমতে দেখা যায়, ইনডোর আউটডোর মিলিয়ে একজন চিকিৎসক বিগত ১ মাসে ৪ হাজার রোগীকে চিকিৎসা সেবা দিয়েছেন। পেকুয়া হাসপাতালের চিকিৎসা সেবার পরিসংখ্যান দেখে সংশ্লিষ্ট অনেকেই বলছেন এটা কেবল বাংলাদেশ বলেই সম্ভব হয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, বিশষজ্ঞ চিকিৎসক দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বৈকালিক সেবা চালিয়ে আসলেও কারো কারো আপত্তিতে সেটাও বন্ধ করে দিতে হয়েছে। পেকুয়া সরকারি হাসাপাতালে অপারেশন থিয়েটার, প্যাথলজী ও ব্লাড ব্যাংক চালু রয়েছে। এক্স-রে সেবা চালু থাকলেও কোন প্রকার এক্স-রে সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়না। হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড়ে চিকিৎসারত রোগী ও স্বজনদের সাথে কথা বলে জানাযায়, ওয়ার্ড়ের বেডে থাকলেও পর্যাপ্ত আবাসিক মেডিকেল অফিসার না থাকায় রোগীকে জরুরী বিভাগেই গিয়েই চিকিৎসা নিতে হয়। রোগীদের অভিযোগ, এখানে যেসব নার্স রয়েছেন তার রোগীদের সেবা প্রদানে অনীহা প্রকাশ করেন। অনেক সময় রোগীদের সাথে খারাপ ব্যবহারও করে থাকেন। রোগী বেডে কাথরাতে থাকলেও নার্সদের কিছু আসে যায়না। বারবার ধরনা দিয়েও তাদের কাছ থেকে সহজে সেবা নেয়া যায়না বলে আক্ষেপ করেছেন অনেকে। হাসপাতালের টয়লেট অপরিচ্ছন্ন থাকে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফার্মেসীতে গেলে ঠিকমত লোকজন পাওয়া যায়না।
পেকুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মুজিবুর রহমান বলেন, পেকুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি একটি ৩১ শয্যার হাসপাতাল হলেও আমরা মূলত এর ৩ গুণ বেশী আবাসিক রোগীকে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছি। একজন চিকিৎসক মাসিক গড়ে ৪ হাজার জন রোগীকে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন। সীমিত সাধ্যের মধ্যে আমাদের সেবার মানসিকতার কোন ত্রুটি নেই। কিন্তু আমাদের লোকবলের সংকটটা তীব্রতর। এভাবে চলতে থাকলে চিকিৎসা সেবা দেয়া খুব কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। চিকিৎসক সহ সকল পদে জনবল চাহিদার বিষয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আমি মনে করি ৫০ শয্যার অনুমোদন পেলে পেকুয়ার মানুষ আরো উন্নতমানের সেবা ভোগ করতে পারবে।











