প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬ । ১২:০০ এএম প্রিন্ট এর তারিখঃ মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬, ১৫ আষাঢ় ১৪৩৩

‎পেকুয়ায় এক যুগেও সংস্কারহীন ৫০০ মিটার সড়ক,জনদুর্ভোগ চরমে

অনলাইন ডেস্ক

‎
‎
‎
‎স্টাফ রিপোর্টার
‎
‎কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার পৌরসভার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রায় ৫০০ মিটার সড়ক দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে সংস্কারের অভাবে বেহাল অবস্থায় পড়ে রয়েছে। খানাখন্দ, কাদা, জলাবদ্ধতা ও ভাঙাচোরা অবস্থার কারণে সড়কটি এখন চলাচলের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষকে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলেও দৃশ্যমান কোনো সংস্কার কার্যক্রম শুরু হয়নি।


‎
‎পৌরসভার কবির আহমদ চৌধুরী বাজার সংলগ্ন ভোলাইয়াঘোনা এলাকার এই সড়কটি শতাধিক পরিবারের প্রায় দুই হাজার মানুষের একমাত্র যাতায়াতের পথ। এছাড়া বাইম্যাখালী, পশ্চিম ভোলাইয়াঘোনা, আশপাশের গ্রাম এবং স্থানীয় ব্যবসায়ী, কৃষক, শিক্ষার্থী ও চাকরিজীবীরাও প্রতিদিন এই সড়ক ব্যবহার করেন। বিকল্প সড়ক না থাকায় এলাকাবাসী বাধ্য হয়েই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন।
‎
‎এদিকে এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে সোমবার (২৯ জুন) দুপুরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পক্ষে তাঁর ব্যক্তিগত প্রেস সচিব ছফওয়ানুল করিম সরেজমিনে সড়কটি পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে সড়কটি দ্রুত সংস্কারের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তাঁর এই আশ্বাসে দীর্ঘদিনের দুর্ভোগে থাকা এলাকাবাসীর মধ্যে স্বস্তি ও আনন্দের সঞ্চার হয়েছে। তারা আশা প্রকাশ করেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত সংস্কারকাজ শুরু করে দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান ঘটাবে।
‎
‎সরেজমিনে দেখা যায়, প্রায় ৫০০ মিটার দীর্ঘ পুরো সড়কজুড়ে অসংখ্য ছোট-বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই গর্তগুলো পানিতে ডুবে ছোট ছোট জলাশয়ের রূপ নেয়। কোথাও হাঁটুসমান কাদা, কোথাও ভেঙে গেছে সড়কের পাশ। ফলে রিকশা, ভ্যান, সিএনজিচালিত অটোরিকশা এমনকি মোটরসাইকেল চালাতেও চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পথচারীদের অনেকেই জুতা হাতে নিয়ে কাদা মাড়িয়ে চলাচল করতে বাধ্য হন।
‎এলাকাবাসী জানান, বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। দিনের পর দিন পানি জমে থাকায় সড়কের অবশিষ্ট অংশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে এবং শিশু, নারী ও বয়স্কদের চলাচল সবচেয়ে বেশি দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
‎সড়কের দুই পাশে রয়েছে ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা। পাশাপাশি সরকার অনুমোদিত ব্র্যাক পরিচালিত দুটি সিপ্টের একটি প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয় অবস্থিত। প্রতিদিন শতাধিক কোমলমতি শিশু এই সড়ক ব্যবহার করে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করে। কাদাময় ও পিচ্ছিল রাস্তায় শিশুদের অনেক সময় পড়ে গিয়ে আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। বৃষ্টির সময় সড়কের পানি বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ ও শ্রেণিকক্ষে ঢুকে পড়ায় পাঠদানও ব্যাহত হয়।
‎স্থানীয় বাসিন্দা ও উজানটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহাব উদ্দিন বলেন,
‎”বছরের পর বছর ধরে জনপ্রতিনিধিদের কাছে সড়কটি সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছি। নির্বাচন এলেই নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, কিন্তু নির্বাচন শেষ হলে আর কেউ খোঁজ নেয় না। দীর্ঘদিনের অবহেলায় সড়কটি এখন মানুষের দুর্ভোগের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।”
‎ব্র্যাক স্কুলের শিক্ষিকা ফাতেমা বেগম বলেন,
‎”এখানে দুটি সিপ্টের একটি প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। বৃষ্টি হলেই রাস্তায় জমে থাকা পানি স্কুল কক্ষে ঢুকে পড়ে। এতে পাঠদান ব্যাহত হয়। ছোট ছোট শিশুরা কাদা মাড়িয়ে স্কুলে আসে, অনেক সময় পড়ে গিয়ে আহতও হয়।”
‎স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা জানান, এই সড়কের কারণে কৃষিপণ্য, মাছ, সবজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বাজারে পরিবহনে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। অনেক যানবাহন খারাপ রাস্তার কারণে এ পথে চলাচল করতে চায় না। এতে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে এবং স্থানীয় অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
‎এলাকার বাসিন্দারা আরও জানান, অসুস্থ রোগীদের হাসপাতালে নিতে চরম দুর্ভোগের শিকার হতে হয়। অনেক সময় অ্যাম্বুলেন্স সড়কের ভেতরে প্রবেশ করতে না পারায় রোগীকে খাটিয়া বা কোলে করে মূল সড়ক পর্যন্ত নিয়ে যেতে হয়। জরুরি চিকিৎসার ক্ষেত্রে এটি বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
‎স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে পৌরসভা, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত ও মৌখিকভাবে আবেদন করা হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দিন দিন বাড়ছে।
‎সচেতন মহলের মতে, এটি শুধু একটি ভাঙাচোরা রাস্তার বিষয় নয়; বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, সামাজিক নিরাপত্তা এবং স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। সড়কটি দ্রুত সংস্কার করা হলে হাজারো মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘবের পাশাপাশি এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষা কার্যক্রম, কৃষিপণ্য পরিবহন এবং জরুরি সেবার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে।
‎এলাকাবাসী সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), পৌর কর্তৃপক্ষ এবং সরকারের দায়িত্বশীল মহলের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। একই সঙ্গে চকরিয়া-পেকুয়া-মাতামুহুরী সংসদীয় আসনের নির্বাচিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে দ্রুত সড়কটি সংস্কারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
‎তাদের ভাষ্য, “এক যুগ ধরে আমরা শুধু আশ্বাস শুনেছি, কিন্তু উন্নয়ন দেখিনি। এবার আর প্রতিশ্রুতি নয়, দ্রুত কাজ শুরু হোক। এই ৫০০ মিটার সড়ক সংস্কার হলে হাজারো মানুষের জীবনযাত্রা সহজ হবে এবং এলাকার সার্বিক উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।”

প্রিন্ট করুন