প্রকাশের সময়: বুধবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৫ । ১২:০৮ এএম প্রিন্ট এর তারিখঃ রবিবার, ২১ জুন ২০২৬, ৬ আষাঢ় ১৪৩৩

থানা হাজতে স্কুলের অফিস সহকারী দুর্জয়ের মৃত্যু: শিক্ষা অধি দফতরের কমিটির তদন্তকালে  চকরিয়া থানার সামনে বিক্ষোভ

এম.জিয়াবুল হক. চকরিয়া

 

কক্সবাজারের চকরিয়া থানা হাজতে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের অফিস সহকারি দূর্জয় চৌধুরীর মৃত্যুর ঘটনায় শিক্ষা অধিদফতর কতৃক গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি সরেজমিনে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছেন। গতকাল মঙ্গলবার ২৬ আগস্ট সকালে তদন্ত টিমের আহবায়ক (প্রধান) মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা চট্টগ্রাম অঞ্চল এর পরিচালক প্রফেসর মোঃ ফজলুল কাদের চৌধুরীর নেতৃত্বে তদন্ত কমিটির সদস্যরা চকরিয়া এসে পৌঁছান। এসময় তদন্ত কমিটির সদস্য মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা চট্টগ্রাম অঞ্চলের আঞ্চলিক উপপরিচালক (মাধ্যমিক) ফরিদুল আলম এবং কমিটির অপর সদস্য চকরিয়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ নজরুল ইসলাম সঙ্গে ছিলেন।

জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির সদস্য ও চকরিয়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ নজরুল ইসলাম বলেন, মঙ্গলবার সকাল দশটার দিকে তদন্ত কমিটির আহবায়কের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটি প্রথমে চকরিয়া সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে যান।সেখানে তদন্ত টিমের বিদ্যালয়ের তদন্ত সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সেক্টর থেকে তথ্য সংগ্রহ করেন এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য গ্রহন করেন।
এরপর দুপুর একটার পরে তদন্ত টিম চকরিয়া থানায় পৌঁছেন। সেখানে তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন। সেখান থেকে বিকাল তিনটার দিকে তদন্ত কমিটির সদস্যরা চকরিয়া উপজেলার ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী কমিশনার (ভুমি) রুপায়ন দেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তদন্ত সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন।

গত ২৪ আগস্ট মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক-১ এসএম জিয়াউল হায়দার হেনরি স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে স্কুলের অফিস সহকারীর মৃত্যুর ঘটনায় চকরিয়া সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রাবেয়া খানমকে ওএসডি করা হয়।
এছাড়া একই বিভাগের অপর আদেশে এ ঘটনায়
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা এর চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালককে প্রধান করে তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটিকে তিনদিনের মধ্যে সরেজমিন তদন্তপূর্বক সুস্পষ্ট মতামত ও প্রমানসহ প্রতিবেদন দাখিলের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়।
শিক্ষা অধিদফতরের ওই আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল মঙ্গলবার গঠিত তদন্ত কমিটি সরেজমিনে চকরিয়া পৌঁছে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেন বলে জানিয়েছেন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ নজরুল ইসলাম।

এদিকে গতকাল মঙ্গলবার ২৬ আগস্ট দুপুরে শিক্ষা অধিদফতর কতৃক গঠিত তদন্ত কমিটি চকরিয়া থানায় তদন্তের জন্য উপস্থিত হলে সে সময় থানার সামনে দুর্জয়ের মৃত্যুর ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার ও বিচার দাবিতে ফেস্টুন হাতে নিয়ে মানববন্ধন করেছে নিহতের আত্মীয় স্বজন, সনাতনী সম্প্রদায়ের শতাধিক নারী-পুরুষ।

এ সময় মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, চকরিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের অফিস সহকারি দূর্জয় চৌধুরীর থানাহাজতে মৃত্যুর চারদিন অতিবাহিত হলেও পুলিশ কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন করেনি। আটক করা হয়নি স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা রাবেয়া খানমকে। উদ্ধার হয়নি দূর্জয় চৌধুরীর ব্যবহৃত ল্যাপটপ। যার কারণে ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ মানুষদের মাঝে। দ্রত স্কুলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকাসহ ওই স্কুলে শিক্ষকসহ প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্ঠান্তমুলক শাস্তি দাবী করেন।

মানববন্ধনে চকরিয়া সার্বজনীন কেন্দ্রীয় কালী মন্দির উন্নয়ন কমিটির সভাপতি ছোটন দাশ গুপ্ত বলেন, দুর্জয় চৌধুরীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যাকারীসহ এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্ঠান্তমূলক শাস্তি চাই।
তিনি দাবি জানান, সম্প্রদায়ের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

দুর্জয় চৌধুরীর বাবা কমল চৌধুরী আক্ষেপ নিয়ে বলেন, তাঁর ছেলে কিছুদিন যাবত শ্বাসকষ্ট রোগে ভুগছেন। গত বৃহস্পতিবার ২১ আগস্ট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা রাবেয়া খানম ফোন করে স্কুলে আসতে বলেন। তখন তাঁকে ফোন করে ছেলের অসুস্থতার খবর জানান। কিন্তু তিনি আমার ছেলেকে পরিকল্পিত ভাবে হত্যার উদ্দেশ্যে স্কুলে আসতে বাধ্যকরে। আমার ছেলের ল্যাপটপ ও ব্যাক্তিগত ব্যাগটা নিয়ে সকাল সাড়ে ৯টায় স্কুলে চলে যান। পরে
সকাল ১১টার দিকে কল করে আমাকে স্কুলে যেতে বলেন স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা রাবেয়া খানম। আমি ১০ মিনিটের মধ্যে স্কুলে যায়। ওখানে গিয়ে দেখি শিক্ষকরা সবাই বসে আছে। সেখানে আমার ছেলে দুর্জয়ও ছিল। এ সময় প্রধান শিক্ষিকা রাবেয়া খানম বলেন, আপনার ছেলে টাকা আত্মসাৎ করেছে। তখন আমি সকল শিক্ষকের সামনে বলি, আমার ছেলে যদি টাকা আত্মসাৎ করে, আমি সব টাকা পরিশোধ করবো, মুচলেকাও দিবো। প্রয়োজনে ওর চাকরি চলে যাক, কিন্তু আপনারা অন্যায়ভাবে কিছু করবেন না।
রাতে চকরিয়া থানার পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন। তারপর তারা আমার ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেন। আমি আমার ছেলে হত্যার সুষ্ঠু বিচার চাই।

তিনি আরও বলেন, আমার ছেলের ল্যাপটপে এমন কিছু তথ্য ছিল, যা ফাঁস করে দেবে ভেবে দুর্জয়কে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করানো হয়েছে। আমার ছেলের ওই ল্যাপটপটি এখনো হদিস দিতে পারেনি পুলিশ।

চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, দুর্জয় চৌধুরী বাবা কমল চৌধুরী বাদী হয়ে এজাহার জমা দিয়েছেন। উর্ধতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে এই ঘটনার সাথে জড়িত সব কিছু বিশ্লেষন করে মামলা রুজু করা হবে বলে জানান ওসি।

প্রসঙ্গতঃ গত বৃহস্পতিবার ২১ আগস্ট সন্ধ্যার আগে চকরিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা রাবেয়া খানম ওই স্কুলের অফিস সহকারি দুর্জয় চৌধুরী চেক জালিয়াতি করে ও নগদে প্রতিষ্টানের ২ লাখ ৮৩ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছেন মর্মে চকরিয়া থানায় একটি অভিযোগ করেন।
ওই অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ দূর্জয় চৌধুরীকে হাজতে আটকে রাখেন। পরদিন শুক্রবার ২২ আগস্ট ভোর ৪টার দিকে থানা হাজতে গলায় ফাঁস লাগানো এবং ঝুলন্ত অবস্থায় তার মৃতদেহ উদ্ধার করেন।

 

প্রিন্ট করুন