পাহাড়ঘেঁষা পেকুয়ায় বিদেশি আমের বাণিজ্যিক বিপ্লব
পাহাড়ঘেঁষা পেকুয়ায় বিদেশি আমের বাণিজ্যিক বিপ্লব
রকিবুল হাসান
কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার শিলখালী, টৈটং ও বারবাকিয়ার পাহাড়ঘেঁষা জনপদে বইছে বিদেশি আমের সুবাস। এক সময় যেসব দুর্লভ জাতের আম কেবল ইন্টারনেটে বা শৌখিন বাগানিদের ডায়েরিতে দেখা যেত, এখন তা পেকুয়ার দিগন্তজোড়া বাগানে দৃশ্যমান। জাপানের বিশ্বখ্যাত ‘মিয়াজাকি’ থেকে শুরু করে থাইল্যান্ডের ‘কিং অব চাকাপাত’—সবই এখন শোভা পাচ্ছে স্থানীয় চাষিদের বাণিজ্যিক বাগানে। ব্যক্তিগত শখের গণ্ডি ছাড়িয়ে এই অঞ্চলে এখন গড়ে উঠছে বিশাল সব আম বাগান, যা স্থানীয় গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা আমূল বদলে দিচ্ছে।
বৈচিত্র্যময় আমের সমারোহ ও পাকার মৌসুম
পেকুয়ায় এখন বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে দামি আম হিসেবে পরিচিত জাপানের ‘মিয়াজাকি’ বা ‘সূর্য ডিম’। নজরকাড়া গাঢ় লালচে রঙের এই আমটি সাধারণত জুলাই-আগস্ট মাসে পূর্ণতা পায়। এর পাশাপাশি থাইল্যান্ডের জনপ্রিয় সোনালি রঙের ‘ন্যামডক মাই’ এবং বাঁকা আকৃতির স্বতন্ত্র স্বাদের ‘মহাচানক’ (ব্যানানা ম্যাংগো) আমগুলোও জুলাই-আগস্ট মাসেই বাজারে আসার অপেক্ষায় রয়েছে।
আগাম জাত হিসেবে পরিচিত ‘কিং অব চাকাপাত’ জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ থেকে পাকতে শুরু করে। আর থাই সবুজ জাত ‘কিউজাই’ কাঁচা ও পাকা—উভয় অবস্থাতেই অত্যন্ত সুস্বাদু, যা পাকবে জুলাই-আগস্ট মাসে। তবে এখানকার কৃষকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সাড়া ফেলেছে বারোমাসি জাত ‘কাটিমন’ (চোকানন)। এটি বছরে একাধিকবার ফলন দেয় বলে সারা বছরই বাজারের চাহিদা মেটাতে সক্ষম হচ্ছে।
এক নজরে আমের ক্যালেন্ডার ও সময়সূচি:
কিং অব চাকাপাত জুলাইয়ের শেষ ভাগে পাকে।
মিয়াজাকি (সূর্য ডিম) জুলাই-আগস্ট মৌসুমে ফলন দেয়।
ন্যামডক মাই ও মহাচানক: বাজারে আসে জুলাই-আগস্ট মাসে।
কিউজাই: জুলাই-আগস্ট (কাঁচা-পাকা দুইভাবেই ভক্ষণযোগ্য)।
কাটিমন: বারোমাসি জাত, যা সারা বছর ফলন দেয়।
মাটির গুণাগুণ ও দেশি জাতের আধিপত্য
পেকুয়ার মাটি বিশেষ করে ‘আম্রপালি’ চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। গত এক দশক ধরে এখানে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিখ্যাত সব জাতের সফল চাষ হচ্ছে। স্থানীয় ‘মনে রেখো নার্সারি’র মালিক মনির উদ্দিন জানান, তারা সরাসরি উত্তরবঙ্গ থেকে ট্রাকযোগে উন্নত মানের চারা সংগ্রহ করে স্থানীয় পর্যায়ে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে সরবরাহ করছেন। আম্রপালি ছাড়াও হাড়িভাঙ্গা, হিমসাগর, ফজলি, মল্লিকা ও গৌরমতির মতো জনপ্রিয় জাতগুলো এখন পেকুয়ার মাটিতে নিয়মিত ফলছে।
বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বন্যহাতির উপদ্রব
অমিত সম্ভাবনার মাঝেও চাষিদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে বন্যহাতির আক্রমণ। স্থানীয় শিলখালী এলাকার ভুক্তভোগী চাষি মোহাম্মদ আরিফ আক্ষেপ করে বলেন, “আমার বিশাল একটি আম বাগান হাতির আক্রমণে তছনছ হয়ে গেছে। বন বিভাগ বনাঞ্চলে আকাশমণি বা ইউক্যালিপটাসের মতো এমন সব গাছ লাগাচ্ছে যা হাতি খায় না। ফলে খাদ্যের সন্ধানে হাতিগুলো লোকালয়ে এসে আমাদের কষ্টার্জিত আম বাগান ধ্বংস করছে। বন বিভাগের উচিত বনাঞ্চলে হাতির পছন্দের দেশীয় ফলদ গাছ লাগানো, যাতে আমাদের এই দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ রক্ষা পায়।
বাজারে রাসায়নিকযুক্ত ফলের ভীতি দূর করতে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিজ আঙিনায় আম চাষের প্রবণতা বেড়েছে। শিলখালী ইউনিয়নের আলিচান মাতবর পাড়ার উদ্যোক্তা রমিজ উদ্দিন অনলাইনে রাজশাহী ও বগুড়া থেকে চারা সংগ্রহ করে গড়ে তুলেছেন বৈচিত্র্যময় এক বাগান। তিনি বলেন, “বিগত কয়েক বছর ধরে আমি পরিবারের জন্য সম্পূর্ণ ফরমালিনমুক্ত আম নিশ্চিত করতে পারছি। মিয়াজাকি বা চাকাপাতের মতো বিদেশি আমের ফলন এখানে চমৎকার হচ্ছে। সঠিক পরিচর্যা ও সরকারি কারিগরি সহায়তা পেলে যে কেউ এই লাভজনক চাষে সফল হতে পারেন।”
পেকুয়া উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবুজার সোহাগ বলেন, এ বছর উপজেলায় বাগান ও বাড়ির আঙিনা মিলিয়ে প্রায় ১২০ হেক্টর জমিতে আম চাষ হচ্ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে হেক্টর প্রতি গড়ে ১২ মেট্রিক টন ফলন আশা করা যাচ্ছে। আমরা কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছি এবং বন্যহাতির উপদ্রব রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
বেলাভূমির পক্ষ থেকে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যথাযথ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বন্যহাতির উপদ্রব নিয়ন্ত্রণ এবং আধুনিক বাজারজাতকরণ সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে পেকুয়া জেলা ছাড়িয়ে সারা দেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় ম্যাঙ্গো হাব বা আম উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত হয়।











